বাংলাদেশের মূকাভিনয়ের বর্তমান হালচাল

By: এস খান 2018-03-21 18:50:45 বিনোদন

২২মার্চ বৃহস্পতিবার বিশ্ব মূকাভিনয় দিবস। নাটক, নৃত্য, সঙ্গীত ইত্যাদি শিল্পমাধ্যমের মতো বর্তমান বাংলাদেশের মূকাভিনয় শিল্পকেও গুরুত্বে আনা আবশ্যক। কারণ অনেক দেরিতে হলেও এই শিল্পটি বাংলাদেশে এখন আলোর মুখ দেখেছে। পার্থপ্রতিম মজুমদারের হাত ধরে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে মূকাভিনয়ের আগমন ঘটে। নানান চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে প্রায় ৩৫ বছর পর নতুন শতকে এসে নিথর মাহবুব এর আন্তরিক চেষ্টা এবং পার্থপ্রতিম মজুমদারেরই সহযোগিতায় শিল্পটি দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে।

সর্বকালের সেরা মূকাভিনেতা হিসেবে স্বীকৃত মার্সেল মার্সো এর জন্মদিনকে সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মূকাভিনয় দিবস হিসেবে পালন করা হয়। বিশ্বখ্যাত এই শিল্পী ১৯২৩-এর ২২ মার্চ ফ্রান্সের স্টার্সবুর্গ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বিংশ শতাব্দীর আধুনিক মূকাভিনয় চর্চা এবং মার্সোর নাম সমার্থক হয়ে ওঠায় তাঁর প্রয়াণের পরে এ দিনটিকেই আন্তর্জাতিকভাবে ‘বিশ্ব মূকাভিনয় দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ২০০৭-এর ২২ সেপ্টেম্বর ৮৪ বছর বয়সে মার্সেল মার্সোর জীবনাবসান ঘটে।

মার্সেল মার্সোরই প্রিয় ছাত্র বর্তমান ফ্রান্স প্রবাসী আমাদের জীবন্ত কিংবদন্তি মূকাভিনয় শিল্পী পার্থপ্রতিম মজুমদার। পার্থপ্রতিম মজুমদার ফ্রান্স প্রবাসী হলে পরবর্তীতে এই শিল্পের চর্চায় নিযুক্ত অনেকেই নিজে পরিচিতি লাভ করার পাশাপাশি শিল্পটির ধারাবাহিকতাও বজায় রেখেছেন। কিন্তু পূর্বে মাইম নিয়ে যারাই কাজ শুরু করেছে বা মাইমের সংগঠন তৈরি করেছেন কয়েক বছর কাজ করে নিজের পরিচিতি তৈরি হবার পর তারা প্রবাসী হয়েছেন। ফলে তাদের প্রতিষ্ঠিত সংগঠনগুলো যেমন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি তেমনি শিল্পের অঙ্গনে শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিতে পারেনি মূকাভিনয় শিল্পও। মূকাভিনয় চর্চার সুবাদে বিদেশে প্রবাসী হয়েছেন এমন শিল্পীদের তালিকার মধ্যে আছেন, পার্থপ্রতিম মজুমদার, কাজী মশহুরুল হুদা, রটি, জিল্লুর রহমান জন, হিরোসহ আরো অনেকে। নতুন শতকের শুরুর দিকে এসে ঢাকার নাট্য সংগঠন স্বপ্নদল গড়ে উঠলে এই দল নাট্য চর্চার পাশাপাশি মূকাভিনয় নিয়ে কাজ করতে এগিয়ে আসে। স্বপ্নদলের প্রধান জাহিদ রিপন ‘সৌভিক মূকাভিনয়’ নামে তখন একটি স্কুলও খোলেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই অজ্ঞাত কারণে সেটি বন্ধ হয়ে যায়।

স্বপ্নদলের হয়েই একসময় কাজ করতেন নিথর মাহবুব। ২০০৬সালে তিনি এই দল থেকে বের হয়ে আসেন। মূকাভিনয় করতে আগ্রহী কর্মী, দর্শক এবং মূকাভিনয়ের প্রদর্শনীর অনুকুল পরিবেশ ইত্যাদির অভাবে ঢাকায় মূকাভিনয়ের যখন বেহাল অবস্থা, ঠিক তখনই এই শিল্পের হাল ধরেন মূকাভিনয় শিল্পী নিথর মাহবুব। মূকাভিনয়ের জনপ্রিয়তা বাড়াতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে তার সাংবাদিকতা পেশা এবং দৃষ্টিনন্দনীয় মূকাভিনয়। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তিনি সংকল্পবদ্ধ যে, যতই পরিচিতি লাভ করেন না কেন কখনোই প্রবাসী হবেন না, দেশে থেকে শিল্পটির বিকাশে কাজ করবেন। তার নান্দনিক মূকাভিনয় এবং আধুনিক মূকাভিনয় প্রযোজনা তৈরির মাধ্যমে তিনি নিজে যেমন আলোকিত হয়েছেন তেমনি বাংলাদেশের মূকাভিনয় শিল্পটিও  দেখেছে আলোর মুখ। তার উত্থানের পাশাপাশি  দেশে নতুন মূকাভিনয় শিল্পী এবং সংগঠন যেমন তৈরি হয়েছে তেমনি সক্রিয় হয়ে উঠেছে দেশে মূকাভিনয়ের পুরনো অনেক সংগঠন এবং শিল্পীরাও। নিথর মাহবুব নিজে মূকাভিনয় চর্চা করেই ক্ষেন্ত থাকেননি, সারা দেশে শিল্পটির বিকাশে এবং নতুন নতুন মূকাভিনয় শিল্পী তৈরিতে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সক্রিয় ভুমিকা রাখছেন তিনি। শিল্পটির প্রচার প্রসারে লক্ষে তিনি আমাদের প্রবাসী গুণী মূকাভিনয় শিল্পীদেরও সহযোগিতা কামনা করেন এবং তাদেরকে দেশে পুনরায় কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেন। যার ফলে পার্থপ্রতিম মজুমদার, কাজী মশহুরুল হুদা বেশ কয়েক বছর টানা দেশে এসে মূকাভিনয় নিয়ে নানা ধরনের কাজ করে গেছেন। যা সামগ্রিকভাবে দেশের মূকাভিনয় শিল্পের চর্চাকে বেগবান করেছে বলে দাবি করেন নিথর মাহবুব। তিনি আরো বলেন, ‘২০০৭ সালে নাটুকে থিয়েটারের আল নোমানের আমন্ত্রণে নাটুকে থিয়েটারে যুক্ত হই, বাংলাদেশে মূকাভিনয়ের নবজাগরণে এই নাটুকে থিয়েটারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই দলের আয়োজনে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় পার্থপ্রতিম মজুমদার ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অনেকগুলো মূকাভিনয় কর্মশালায় প্রশিক্ষণ দেন। যেখানে পার্থদারের সহকারী হিসেবে ছিলাম আমি, নাটুকের প্রধান আল নোমান, সবুজ এবং হিরোসহ অনেকে। পার্থদা তখন আমাদের অনুপ্রেরণায় বছরে একবার দেশে আসতেন, পরপর পাঁচ বছরে প্রায় ৩৫টি জেলার নাট্যসংগঠনের কর্মী ও মূকাভিনয়ে আগ্রহী ছেলে-মেয়েরা প্রশিক্ষণ নিতে সক্ষম হয়। যেহেতু মূকাভিনয় চর্চার পাশাপাশি সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত ছিলাম; তাই মূকাভিনয়ের প্রসারের জন্য পার্থদার দেশে আসা সহ প্রতিটি কর্মশালার সংবাদ সাংবাদিক বন্ধুদের সহযোগিতায় বিভিন্ন পত্রিকা এবং টিবি চ্যানেলের মাধ্যমে জোড়ালো প্রচার চালিয়ে দেশের মানুষের কাছে পৌছে দিতে সক্রীয় ছিলাম। পরর্তিতে সারা দেশে মূকাভিনয় শিল্পের চর্চাকে আরো বেগবান করতে বিভিন্ন জেলায় মূকাভিনয় চর্চার সাথে যুক্ত আছে এমন কিছু দলকে নিয়ে চট্টগ্রামের অন্যতম মূকাভিনয়ের সংগঠন প্যান্টোমাইম মুভম্যান্ট এর বর্তমান সভাপতি রিজোয়ান রাজন চট্টগ্রামে একটি মূকাভিনয় শিল্পীদের সম্শেলনের আয়োজন করে সেখান থেকে দেশে একটি মূকাভিনয় ফেডারেশান গঠনের প্রস্তাব তোলেন, যার বাস্তবায়ন হয় ২০১২সালে এসে। এই ফেডারেশানে আমাকেও অন্তভুক্ত করা হয়। কিন্তু তাদের কার্যক্রমের সাথে চিন্তার মিল হচ্ছিলনা বলে শুরুর দিকেই সেখান থেকে সরে এসে আবার নিজের মতো কাজ করতে থাকি।’

নিজে এসব কর্মকান্ডের পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন নতুন শিল্পী তৈরি করতে নিথর মাহবুব ২০০৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মাইম আর্ট নামের একটি মূকাভিনয় সংগঠনও তৈরি করেন। গত ১৫ মার্চ হয়ে গেল এই দলটির ১০ বছর পূর্তি উৎসব, টানা দশ বছর ধরে শুধু মাইম নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কাজ করে এই দলটি ১০ বছর অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের মূকাভিনয়ের ইতিহাসে যা একটি বিরল ঘটনা।

মূকাভিনয়ের জোয়ার দেখে বর্তমানে এর চর্চার সাথে কোনরকম নিজেকে যুক্ত করে নিজেকে আলোচনায় এনে বিদেশে পাড়ি জমাতে অনেকেই এখন তৎপর, এবং মূকাভিনয়কে পুঁজি করে নিজের ফায়দা লুটতেও কিছু ব্যক্তি বা সংগঠন তৎপর হয়ে উঠেছে, যা মূকাভিনয়ের এই নবজাগরণে অনেকটাই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে, এবং দেশের মূকাভিনয়ের ইতিহাসের বিকৃতি ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশে মূকাভিনয় শিল্পের নবজাগরণকে অব্যাহত রাখতে হলে বাংলাদেশ গ্রুপথিয়েটার ফেডারেশন, ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ কেন্দ্র আইটিআই, পথনাটক ইত্যাদি অভিভাবক সংগঠনগুলো তৎপর হওয়া আবশ্যক এবং প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে যথাযথ পদক্ষেপ প্রয়োজন।